৬.১৫ বুয়েট-বিইপিআরসি ইজিবাইক প্রকল্প: জন্ম থেকে পাইলট
নীতিমালার খসড়াগুলো যখন মন্ত্রণালয়ের টেবিলে, তখন কারিগরি সমাধানের কাজটি এগিয়েছে অন্য একটি পথে— বুয়েটের একটি গবেষণা প্রকল্পে। নিচে সেই প্রকল্পের যাত্রা ধাপে ধাপে বর্ণিত হলো।
৬.১৫.১ প্রকল্পের জন্ম
বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিল (বিইপিআরসি) ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত “Development of a Design Standard for Easy Bike in Bangladesh” শিরোনামে একটি প্রকল্প পরিচালনা করে। বুয়েটের যন্ত্রকৌশল ও তড়িৎ কৌশল বিভাগ যৌথভাবে এটি বাস্তবায়ন করে, আর লক্ষ্য ছিল ইজিবাইকের উৎপাদন, সংযোজন ও আমদানির জন্য একটি মান তৈরি করা [৯৫]। ডেইলি স্টারের একটি মতামত-নিবন্ধ প্রকল্পের তিনটি মূল নিরাপত্তা-প্রস্তাব চিহ্নিত করে—উন্নত ব্রেক, দরজা সংযোজন ও আসন-সংখ্যা পরিবর্তন। একই নিবন্ধ সতর্ক করে যে নম্বর প্লেটের অবৈধ বিক্রি ও নিম্নমানের ব্যাটারির বাজারে জড়িত অবৈধ অর্থ এই পরিবর্তনের বড় বাধা হতে পারে [৯৫]।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নকশাটি তৈরি করেছে যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. এহসানের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের দল। দলে ছিলেন যন্ত্রকৌশলের অধ্যাপক এ সালাম আকন্দ ও মো. আমান উদ্দীন, ইইই বিভাগের অধ্যাপক মো. জিয়াউর রহমান খান, এবং গবেষণা প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান ও আবদুল আজিজ ভুঁইয়া। অধ্যাপক এহসান জানান, তিনি ২০২২ সাল থেকে এই কাজে যুক্ত এবং আগে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেও ফল পাননি [৯৯]।
দলটি দেশে প্রচলিত ১২ ধরনের ব্যাটারিচালিত রিকশার নিরাপত্তা-ত্রুটি বিশ্লেষণ করে ১৬টি বৈশিষ্ট্যসহ একটি নকশা দাঁড় করায়।
৬.১৫.২ নিষেধাজ্ঞার চক্র (২০২৪)
প্রকল্পের প্রস্তাবনা যখন তৈরি, তখনও সরকারি নীতির ঝোঁক ছিল নিষেধাজ্ঞার দিকে। ২০২৪ সালের ১৫ মে তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের নির্দেশ দেন। চালকেরা সড়ক অবরোধ করেন; ১৯ মে মিরপুরে সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হন। ২০ মে তিনি ঘোষণা করেন যে প্রধানমন্ত্রী নিম্ন-আয়ের চালকদের দুর্ভোগ বিবেচনায় রাজধানীতে চলাচলের অনুমতি দিয়েছেন, তবে মহাসড়কে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে [৯৭]।
সেদিনের বক্তব্যে মন্ত্রী নীতিগত দ্বিধাটি নিজেই সামনে আনেন—“প্রথম অগ্রাধিকার কোনটি—জীবিকা,
না জীবন?” [৯৬]। তাঁর যুক্তি ছিল, বাস বা ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে ইজিবাইকের যাত্রী ও চালকই প্রাণ হারান [৯৬]।
জুলাই অভ্যুত্থানের পরও একই চক্র ফিরে আসে। ঢাকার রাস্তা রাতারাতি ছেয়ে যায় অটোরিকশায়। পুলিশ ও প্রশাসনের অনুপস্থিতিতে প্যাডেল চালিত অটোরিকশাও অনুপস্থিত হয়ে পড়লো। ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর হাইকোর্ট তিন দিনের মধ্যে ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের নির্দেশ দেন; চালকেরা আবার সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন, এবং ২৫ নভেম্বর আপিল বিভাগ সরকারের আবেদনে এক মাসের স্থিতাবস্থা দেন [৯৭]।
৬.১৫.৩ নকশা থেকে নগর-নীতিতে (২০২৫)
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বুয়েটের নকশা প্রথমবার বাস্তবায়নের পথে আসে। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন গুলশান সোসাইটি ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশসহ অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠকে বুয়েট-নির্দেশিত নতুন মডেলের ব্যাটারি রিকশা সড়কে নামানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করে [৯৮]। এক সপ্তাহ পর, ২৯ এপ্রিল, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সেমিনারে প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ জানান, প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা আর চলতে দেওয়া হবে না, তবে মান মেনে “অভ্যন্তরীণ সড়কে ই-
রিকশা চলতে দেওয়া হবে” [১০০]। একই সেমিনারে নীতি ও মান নির্ধারণে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়, এবং প্রোটোটাইপ নির্মাতাদের বুয়েট-বিইপিআরসি ইজিবাইক প্রকল্পের প্রস্তাবনা অনুসরণ করতে বলা হয় [১০০]।
প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রশাসক এজাজ চালকের লাইসেন্স, যানের নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ, এলাকা-নির্দিষ্ট চলাচল ও সরকার-নির্ধারিত ভাড়ার পরিকল্পনা জানান। পুরোনো রিকশা প্রসঙ্গে তাঁর উত্তর ছিল—“আমরা খুব ধীর প্রক্রিয়ায় এগুলোকে সরিয়ে ফেলব।” [৯৯]
একই প্রতিবেদনে খরচের প্রথম প্রকাশ্য হিসাব পাওয়া যায়। নির্মাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বুয়েট দল জানতে পারে, নতুন রিকশার দাম দেড় লাখ টাকার কাছাকাছি হতে পারে। বিভাটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের হিসাবে এর মধ্যে ব্যাটারি ৫০–৬০ হাজার টাকা ও দেড় বছর পরপর ব্যাটারি বদলের কথা বলেন [৯৯]। অধ্যাপক এহসান ব্যাখ্যা করেন যে প্যাডেল রিকশার কাঠামো ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটারের জন্য তৈরি নয় এবং এর ব্রেক বড়জোর ১০ কিলোমিটার গতি সামলাতে পারে [৯৯]।
বছরের শেষে আইনি কাঠামো আসে। স্থানীয় সরকার বিভাগ ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর “সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৫” জারি করে, যা ১৭ ডিসেম্বর গেজেটে প্রকাশিত হয় [১০৩]।
৬.১৫.৪ পাইলট কর্মসূচি (জানুয়ারি ২০২৬)
২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি আফতাবনগর (উত্তর সিটি) ও জিগাতলায় (দক্ষিণ সিটি) পৃথক অনুষ্ঠানে বুয়েট- উদ্ভাবিত তিন চাকার স্বল্পগতির ই-রিকশার পাইলট কর্মসূচি উদ্বোধন করা হয়। আফতাবনগরে নির্ধারিত প্রবেশ-সড়কে, ধানমন্ডিতে নতুন ই-রিকশা এবং মতিঝিলে প্যাডেল বা ব্যাটারি রিকশা থেকে রূপান্তরিত ই- রিকশা চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয় [১০১]। নকশাটি আগে মন্ত্রণালয়ের কারিগরি কমিটির অনুমোদন পেয়েছিল [১০১]।
স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান পাইলটের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেন—নকশা, কাঠামো, ব্রেক ও ব্যাটারি-নিরাপত্তা বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষিত হতে হবে, এবং “এই পাইলট কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা বাস্তব
সড়কে সেই মান যাচাই করছি।” [১০১]
প্রতিবেদনে পাইলট যানের কারিগরি তথ্য: ৩৮ ভোল্টের লিথিয়াম ব্যাটারি, এক চার্জে প্রায় ৭০–৮০ কিলোমিটার, উন্নত ব্রেক ও গতি-নিয়ন্ত্রণ। মূল্যায়নের বিষয় ছিল ব্রেকিং, ব্যাটারির কার্যকারিতা, গতি নিয়ন্ত্রণ, আরাম, কম্পন সহনশীলতা ও চালকের নিয়ন্ত্রণ-দক্ষতা। নির্ধারিত এলাকার বাইরে বা প্রধান সড়কে চলা ঠেকাতে জিও-ফেন্সিংয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়; কোন এলাকায় কতটি ই-রিকশা চলবে তা ঠিক করবে ডিএমপি। ততদিনে দুই সিটি প্রায় ২৪ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স দিয়েছিল [১০১]।
৬.১৫.৫ থমকে যাওয়া (মে ২০২৬)
পাইলটের চার মাস পর মানবজমিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সীমিত সংখ্যক ই-রিকশা তৈরির অনুমোদন পেয়েছিল আকিজ, হাইটেক পাওয়ার ও মনির অটোরিকশা ইঞ্জিনিয়ারিং। [১০২] বুয়েটের হিট ইঞ্জিন ল্যাবের ইনচার্জ ইন্সট্রাক্টর থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে অক্টোবর ২০২৬ অব্ধি লাইসেন্স প্রাপ্ত কোম্পানির সংখ্যা ১২। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই সিটিতে নতুন প্রশাসক আসেন।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত বাধাগুলো হলো: পুরোনো যান প্রতিস্থাপনের নির্দিষ্ট রোডম্যাপ নেই, চালক-প্রশিক্ষণ শুরু হয়নি, অলিগলিতে পুরোনো নকশার রিকশা তৈরি এখনো চলছে, এবং সামনে সিটি নির্বাচন [১০২]। দক্ষিণ সিটির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম জানান, ই-রিকশা-সংক্রান্ত আইন হয়েছে, বিধিমালা প্রণয়ন চলছে, পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কারখানা পরিদর্শন-প্রতিবেদন স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠানো হয়েছে, এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয় দেবে [১০২]।
৬.১৬ বর্তমান অবস্থা (অক্টোবর ২০২৬)
আইনি ভিত্তি: ২০২৬ সালের ১৩ আগস্ট স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সভাপতিত্বে এক সভায় জানানো হয়, সিটি করপোরেশন আইন ২০০৯ ও সংশোধন আইন ২০২৬-এর আলোকে ই-রিকশা নীতিমালা তৈরি হচ্ছে। সিটি এলাকায় নিবন্ধন ও লাইসেন্স দেওয়ার সুযোগ রাখতে সংশোধন আইনে সংশ্লিষ্ট ধারা ও তফসিল ইতোমধ্যে বদলানো হয়েছে। সিটি, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের জন্য একটি সমন্বিত লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ নির্ধারণের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে [১০৩]। সভায় বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বিশেষজ্ঞ মতামত দেন [১০৩]।
নীতিমালার খসড়া শর্ত: ৩০ আগস্ট প্রতিমন্ত্রী জানান, নীতিমালা চূড়ান্ত পর্যায়ে এবং আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে [১০৪]। প্রকাশিত শর্তগুলো হলো:
সারণি ৬.৩: ই-রিকশা নীতিমালার প্রকাশিত খসড়া শর্ত
| বিষয় | প্রস্তাবিত শর্ত [১০৪] |
|---|---|
| প্রধান সড়ক | ব্যাটারিচালিত ও ইলেকট্রিক অটোরিকশা নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা |
| যাত্রী-সীমা | সর্বোচ্চ চার যাত্রীর ই-রিকশা নিবন্ধন পাবে; ছয় যাত্রীর যান ঢাকার দুই সিটিতে নিবন্ধন পাবে না |
| কারিগরি প্রত্যয়ন | বুয়েট, অন্যান্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা জেলা সরকারি পলিটেকনিকের অটোমোবাইল শাখার প্রত্যয়ন বাধ্যতামূলক |
| ফিটনেস | ট্রাফিক বিভাগের ফিটনেস সনদ ছাড়া নিবন্ধন নয় |
| জোনিং | দুই সিটিতে চারটি করে মোট আটটি জোন; প্রতিটি জোনে আলাদা রং; আন্তঃজোন চলাচল রোধ |
| চার্জিং | পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুতে চার্জ; একপর্যায়ে বাধ্যতামূলক |
প্রতিবেদনে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও কিউআর কোডের মাধ্যমে ক্লোন নিবন্ধন ঠেকানোর পরিকল্পনাও উল্লেখ আছে [৯৭]। ১৬ আগস্ট ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মো. মাসুদ করিম জানান, যন্ত্রচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নীতিমালার কাজ চলছে এবং সরকারের উচ্চপর্যায় বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে [১০৫]। এর মধ্যেই ২০২৬ সালের শুরু থেকে রাস্তায় অটোরিকশা নিয়ন্ত্রনে, বুয়েটের নকশার বাইরের অটোরিকশাগুলোকে ট্রাফিক পুলিশ বিভাগ ডাম্পিং এ পাঠাতে শুরু করে।
খাতের বাস্তবতা
- দুর্ঘটনার পরিমাণ অনেক বেশি: বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে ২০২৫ সালে ৬,৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯,১১১ জন নিহত; এর ১৩.৫৪ শতাংশ দুর্ঘটনায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা জড়িত।
- লাইসেন্সিং এখতিয়ার নিয়ে টানাপোড়েন: বিআরটিএ বলছে দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের দেওয়া হয়নি; সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ২০২৫ সালে একটি ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতির খসড়া করেছিল, পরে স্থানীয় সরকার বিভাগ আলাদা নির্দেশিকা তৈরি করে। এছাড়াও সিটি কর্পোরেশনও লাইসেন্সিং কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ নিয়েছে। বস্তুত কে যে আসল কর্তৃপক্ষ এটিই অজানা।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক মোহাম্মদ সুবাইল বিন আলমের মন্তব্যের সাথে আমরা একমত- “যে যান ইতোমধ্যে একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে, তাকে
নিষিদ্ধ করা যায় না।” [৯৭]
৬.১৭ পুলিশের অটোরিকশা ডাম্পিং: সংবাদপত্রের চিত্র বনাম রাস্তার বাস্তব পরিস্থিতি
ঢাকার মূল সড়কে যানজট ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনতে ট্রাফিক পুলিশের অন্যতম প্রধান পদক্ষেপ হলো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা আটক করে ডাম্পিংয়ে (জব্দ তালিকা) পাঠানো। সংবাদপত্রের পাতা খুললেই প্রায় প্রতিদিন চোখে পড়ে, "রাজধানীতে কয়েক শত অটোরিকশা ডাম্পিং" বা "মূল সড়কে ওঠায় অটোরিকশার বিরুদ্ধে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান"। প্রকাশিত ডেটা অনুযায়ী, ট্রাফিক পুলিশ প্রতিদিন শত শত অটোরিকশা আটক করছে, ব্যাটারি খুলে নিচ্ছে বা পুরো গাড়ি ডাম্পিং স্টেশনে পাঠাচ্ছে। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশের এই কঠোর অবস্থান সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত ও বেশ গুরুত্বের সাথেই প্রচারিত হচ্ছে।
তবে পত্রিকার খবরের বাইরের বাস্তব চিত্রটি বেশ জটিল, যা একইসাথে মানবিক সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রমাণ দেয়।
চালকদের চরম হতাশা ও ঋণের ফাঁদ: একটি অটোরিকশা ডাম্পিংয়ে যাওয়ার অর্থ হলো একজন নিম্ন আয়ের মানুষের উপার্জনের একমাত্র পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়া। বাস্তব চিত্র হলো, বেশিরভাগ চালকই এনজিও থেকে কিস্তিতে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এই রিকশাগুলো কেনেন। গাড়ি ডাম্পিংয়ে গেলে একদিকে যেমন তাদের ঋণের কিস্তি আটকে যায়, অন্যদিকে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। ডাম্পিং স্টেশনগুলোর বাইরে প্রায়ই চালকদের কান্না আর চরম হতাশার চিত্র দেখা যায়।
সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ও ইঁদুর-বিড়াল খেলা: ডাম্পিংয়ের ডেটা হয়তো কাগজে-কলমে সফল অভিযানের প্রমাণ দেয়, কিন্তু বাস্তবতা হলো এটি অনেক ক্ষেত্রেই একটি চক্রে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ডাম্পিংয়ে যাওয়া গাড়িগুলো আইনি প্রক্রিয়ায় জরিমানার পাশাপাশি অনেক সময় স্থানীয় দালাল বা অসাধু চক্রের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ছাড়িয়ে আনা হয়। ফলে পুলিশের এই অভিযান অনেকটা 'ইঁদুর-বিড়াল' খেলায় পরিণত হয়েছে। যে গাড়ি আজ ডাম্পিংয়ে যাচ্ছে, কয়েক দিন পর সেই একই গাড়ি হয়তো আবার কোনো এলাকার রাস্তায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এতে ডাম্পিংয়ের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে।
পুলিশের এই অভিযানের ফলে সাধারণ মানুষের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। মূল সড়কগুলোতে রিকশা কমে গেলে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কিছুটা কমে, যা প্রাইভেট কার বা বাসের যাত্রীদের জন্য স্বস্তিদায়ক। কিন্তু যে রাস্তায় তাদের গন্তব্যের বাস চলে না, সেখানে সাধারণ যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
পরিশেষে বলা যায়, পত্রিকার পাতায় অটোরিকশা ডাম্পিংয়ের পরিসংখ্যান হয়তো সাময়িক শৃঙ্খলা ফেরার ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে—শুধুমাত্র ডাম্পিং বা জরিমানা করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর পেছনে থাকা লাখো মানুষের জীবিকা, অসাধু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যকে পাশ কাটিয়ে কোনো কার্যকর পরিবর্তন আনা কঠিন। যানজট নিরসন ও চালকদের পুনর্বাসনের মধ্যে সমন্বয় করে একটি বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়নই এর একমাত্র সমাধান।
৬.১৮ দুটি ধারা, একটি প্রকল্প
সংবাদমাধ্যমে “বুয়েটের ইজিবাইক মান” ও “বুয়েটের ই-রিকশা” প্রায়ই মিশে যায়, তাই পার্থক্যটি স্পষ্ট করা দরকার। প্রথমটি ২০২১–২৩ সালের বিইপিআরসি প্রকল্পের তিন-পর্যায়ের নীতিমালা, যাতে ২P+D ও ৪P+D দুই কনফিগারেশন, রেট্রোফিট, টাইপ-অনুমোদন ও পরীক্ষার মানদণ্ড আছে (সপ্তম অধ্যায়)। দ্বিতীয়টি ওই মানদণ্ডের ভিত্তিতে তৈরি একটি নির্দিষ্ট স্বল্পগতির যান, যা ২০২৫–২৬ সালে সিটি করপোরেশনের পাইলটে ব্যবহৃত হয়েছে [৯৯][১০১]। অর্থাৎ পাইলট যানটি কার্যত নীতিমালার পর্যায় ২- এর একটি বাস্তব রূপ।
৬.১৯ নির্মাতার পথ: একটি যান বৈধভাবে রাস্তায় নামানোর ধাপ
বাংলাদেশে যে হাজার হাজার ওয়ার্কশপ আজ ইজিবাইক বানায়, এবং যে নতুন উদ্যোগগুলো এই বাজারে প্রবেশ করতে চায়, তাদের সামনে একটি বাস্তব প্রশ্ন: তিনটি খসড়া নীতিমালা আর একটি টাইপ-অনুমোদন প্রস্তাবনা যদি একসঙ্গে কার্যকর হয়, তবে একটি যান বৈধভাবে রাস্তায় নামাতে ঠিক কী কী ধাপ পার হতে হবে? নিচে আমরা প্রাপ্ত দলিলগুলো থেকে সেই ধাপগুলো ক্রমানুসারে সাজিয়েছি। যেহেতু সব দলিলই খসড়া, তাই এটি একটি সম্ভাব্য পথ- চূড়ান্ত গেজেটের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে।
৬.১৯.১ প্রতিষ্ঠান-স্তরের পূর্বশর্ত
বিডা নিবন্ধন: বুয়েট প্রস্তাবনার পর্যায় ২ এবং খসড়া থ্রি-হুইলার নীতিমালা - উভয়ই বলছে, কারখানার নিবন্ধন বা তালিকাভুক্তি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) দ্বারা হবে [১] [৩২]। এটি প্রথম ধাপ: একটি আইনি সত্তা, একটি কারখানার ঠিকানা, একটি বিনিয়োগ-নিবন্ধন।
বিআরটিএ তালিকাভুক্তি: খসড়া থ্রি-হুইলার নীতিমালা অনুযায়ী প্রস্তুতকারককে বিআরটিএ-র তালিকাভুক্ত হতে হবে এবং তালিকাভুক্তি ছাড়া কার্যক্রম চালানো যাবে না [১]। ইভি নীতিমালার ধারা ৪.৩.৩ এর সঙ্গে যুক্ত: তালিকাবিহীন উৎপাদনকারী যান হস্তান্তরই করতে পারবে না।
ব্র্যান্ড: বুয়েট প্রস্তাবনা বলছে, নির্মাতারা নিজস্ব ব্র্যান্ড নামের অধীনে টাইপ অনুমোদন নেবেন [৩২]। অর্থাৎ “বোরাক” বা “মিশুক” একটি কনফিগারেশনের নাম, ব্র্যান্ড নয়; প্রতিটি নির্মাতাকে তার নিজস্ব নাম ও পরিচয়ে অনুমোদন নিতে হবে এবং সেই নামের দায় বহন করতে হবে।
৬.১৯.২ যন্ত্রাংশ-স্তরের পূর্বশর্ত
খসড়া থ্রি-হুইলার নীতিমালার সবচেয়ে ব্যাপক শর্তটি এখানে: মোটর, কন্ট্রোলার, গিয়ারবক্স, এক্সেল, চাকা, ব্রেক, হেডলাইট, শক অ্যাবজর্বার, ব্যাটারি ও চার্জার সব যন্ত্রাংশ বিএসটিআই-অনুমোদিত হতে হবে, এবং শুধুমাত্র নতুন যন্ত্রাংশ আমদানি করা যাবে [১]। একজন নির্মাতার জন্য এর অর্থ: প্রতিটি সরবরাহকারীর কাছ থেকে বিএসটিআই সনদ বা তার সমতুল্য মান-প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে, এবং পুনর্নির্মিত বা ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের সরবরাহ-চেইন -যা আজ খাতের একটি বড় অংশ- সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
বাস্তব সমস্যা: বিএসটিআই-র বর্তমানে ইজিবাইকের মোটর, কন্ট্রোলার বা ট্র্যাকশন ব্যাটারির জন্য কোনো নির্দিষ্ট মান নেই। "বিএসটিআই-অনুমোদিত” শর্তটি তাই কার্যকর হওয়ার আগে বিএসটিআই-কে মান লিখতে হবে এবং সেখানেই অষ্টম অধ্যায়ের AIS-১৫৬-সমতুল্য মানের সুপারিশ প্রাসঙ্গিক। একজন নির্মাতার পক্ষে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হলো এখনই এমন সরবরাহকারী বাছাই করা যাদের যন্ত্রাংশ ইতিমধ্যে ভারতের AIS বা আন্তর্জাতিক IEC মান পূরণ করে- যাতে বিএসটিআই মান এলে পুনরায় সরবরাহকারী বদলাতে না হয়।
৬.২০ সমন্বিত সময়রেখা
নীতি ও প্রকল্প— দুই ধারার ঘটনাগুলো একসঙ্গে সাজালে বোঝা যায়, গত পাঁচ বছরে কতগুলো উদ্যোগ পাশাপাশি চলেছে এবং কোথায় তারা একে অপরকে ছুঁয়েছে।
সারণি ৬.৪: নীতি ও বুয়েট-বিইপিআরসি প্রকল্পের সমন্বিত সময়রেখা
| সময় | ঘটনা |
|---|---|
| ২০০২ | ইজিবাইকের প্রথম আবির্ভাব |
| অক্টো ২০২১ – সেপ্টে ২০২৩ | বিইপিআরসি-অর্থায়িত ইজিবাইক নকশা-মান প্রকল্প, বুয়েট |
| ১৫–২০ মে ২০২৪ | ঢাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিষিদ্ধের চেষ্টা; সংঘর্ষ; পাঁচ দিনের মধ্যে প্রত্যাহার |
| ১৯–২৫ নভে ২০২৪ | হাইকোর্টের তিন দিনের নির্দেশ; আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থা |
| ২৪ মার্চ ২০২৫ | বিআরটিএ দুটি খসড়া নীতিমালা সড়ক পরিবহন বিভাগে জমা দেয় |
| ২২ এপ্রিল ২০২৫ | ডিএসসিসি: বুয়েট মডেল নামানোর পরিকল্পনা |
| ২৯ এপ্রিল ২০২৫ | ডিএনসিসি সেমিনার: প্রধান সড়কে না, অভ্যন্তরীণ সড়কে মানসম্মত ই-রিকশা |
| আগস্ট ২০২৫ | ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালার খসড়া সংবাদমাধ্যমে |
| অক্টোবর ২০২৫ | ডিএনসিসি বুয়েট-অনুমোদিত মডেলকে অভ্যন্তরীণ সড়কে অনুমতির ঘোষণা |
| ১৪/১৭ ডিসে ২০২৫ | ই-রিকশা চলাচল বিধিমালা ২০২৫ জারি ও গেজেট |
| ৩ জানু ২০২৬ | আফতাবনগর ও জিগাতলায় বুয়েট-উদ্ভাবিত ই-রিকশার পাইলট উদ্বোধন |
| এপ্রিল ২০২৬ | শিল্প মন্ত্রণালয়: ইভি শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা "এ বছরই" |
| মে ২০২৬ | পাইলট থমকে যাওয়ার প্রতিবেদন; ২০২৬–২৭ বাজেটে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় অগ্রিম আয়কর প্রস্তাব |
| জুলাই ২০২৬ | ইভি নীতিমালার স্টেকহোল্ডার কর্মশালায় ইজিবাইক অন্তর্ভুক্তির দাবি |
| ১৩ আগস্ট ২০২৬ | সংশোধন আইন ২০২৬; সমন্বিিত নীতিমালার উদ্যোগ; ই-রিকশা বিধিমালা আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ে |
| ৩০ আগস্ট ২০২৬ | নীতিমালা চূড়ান্ত পর্যায়ে: আট জোন, চার-যাত্রী সীমা, প্রত্যয়ন |
| ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে |
উৎস: ৬.১–৬.১৮ অনুচ্ছেদের তথ্যসূত্র।
এই উদ্যোগগুলোর কেন্দ্রে যে কারিগরি দলিলটি দাঁড়িয়ে আছে— বুয়েট-বিইপিআরসি প্রকল্পের প্রস্তাবিত নীতিমালা— পরের অধ্যায়ে তা হুবহু উপস্থাপন করা হলো।